করোনার বড় ধাক্কা যেভাবে সামাল দেয় ময়মনসিংহ হাসপাতাল

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশাসনের শক্তিশালী মনিটরিং, ডাক্তার, নার্স সহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা ইউনিটের করোনার বড় একটি ধাক্কা সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে। যে রোগের বিশ্বব্যাপী কোন চিকিৎসা নেই। সেখানে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

প্রশংসায় ভাসছেন হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরা। ভাল চিকিৎসা ও ভাল ব্যবস্থাপনার সুনামের কারণে ময়মনসিংহ বিভাগের ৪টি জেলাসহ আশপাশের আরো ৬টি জেলাসহ ১০টি জেলার করোনার মুমূর্ষ রোগীরা ছুটে এসেছে এই হাসপাতালে। ফলে রোগীর সংখ্যা আশংকাজনক হারে বেড়ে চরম আকার ধারণ করে। এসময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক ও দানশীল ব্যক্তির সহযোগিতার মাধ্যমে সফলভাবে সামাল দিতে সক্ষম হন। হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডাঃ ওয়ায়েজ উদ্দীন ফরাজী বলেছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল ফজলুল কবীর এর সুদক্ষ পরিকল্পনা ও তদারিকের মাধ্যমেই সফলভাবে বিশাল করোনা রোগী চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়েছে।

তিনি কাউকে চাপ সৃষ্টি না করে ডাক্তার, নার্স সহ অন্যান্যদের বুঝিয়ে মনোবল শক্ত রেখেছেন। যার ফলে দিন রাত অতিরিক্ত পরিশ্রম করেও কেউ অস্বস্তি বা বিরক্ত বোধ করেননি। হাসপাতাল সুত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২০সালে এপ্রিলে করোনা ইউনিট চালু হওয়ার পর থেকে গত ২৫ সেপ্টেম্বর’২১ পর্যন্ত করোনা ও করোনা উপসর্গ নিয়ে গুরুতর অসুস্থ ১০ হাজার ৬১০ রোগী ভর্তি হয়েছে, এর মধ্যে করোনা পজিটিভ ছিল ৩ হাজার ৪৪৫ জন, করোনা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল ৭ হাজার ১৬৫ জন। ভর্তিকৃতদের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৪ জনে মুত্যু হয়েছে।

এরমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৫৩১জন ও করোনা উপসর্গে ১ হাজার ২৪৩জনের মুত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে অধিকাংশ করোনা আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিল। জীবনের ঝুকি নিয়ে ডাক্তার ও নার্সসহ অন্যান্যরা অক্লান্ত পরিশমের ফলে গুরুতর অসুস্থ ৮ হাজার ৭৫১জন করোনা আক্রান্ত ও করোনা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪জন করোনা রোগী ও ৫ হাজার ৭৪৭ জন করোনা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়ার রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। অধিকাংশ মূমূর্ষ রোগীরা চিকিৎসাসেবা পেয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ায় রোগী ও স্বজনরা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার উচ্চ প্রশংসা করেছেন। ২০২০সালে এপ্রিল মাসে এসকে হাসপাতালে জরার্জীর্ণ ভবনে স্বল্প পরিসরে করোনা ইউনিট চালু করা হয়। সেখানে বিশাল সংখ্যক রোগী চিকিৎসা সেবা দেয়া সম্ভব ছিল না।

সেখানে অক্সিজেনের ব্যবস্থা ছিল না। পরবর্তী বিএমএসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের দাবী প্রেক্ষিতে গত ১৩ জুন’২০ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের ৫ম ও ৮ম তলায় ২২০ শয্যার সাময়িক করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল চালু করা হয়। ফলে এই বিশাল করোনা রোগীর চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, চরপাড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছিল পর্যাপ্ত সেন্টাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা, ছিল আইসিইউ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত বিছানা, ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্য জনবল। যা এসকে হাসপাতালে তা কভার করা সম্ভব ছিল না। নতুন ভবনে করোনা ইউনিট চালু হওয়ার থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছিল ২০২১ সালের জুলাই ও আগস্ট মাস। এই দু’মাসে করোনা ইউনিটে মারা যায় ৮১৮জন। এসময় গড়ে প্রতিদিন ৪০২ বেডের করোনা ইউনিটে ৫শতাধিক রোগী ভর্তি ছিল। তারপর গত জুলাই ও আগস্টে মাসে অক্সিজেনের সংকট সৃস্টি হয়।

পরে দানশীল ব্যক্তিদের উদ্যোগে শতশত অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহের মাধ্যমে তা মোকাবেলা করা হয়। বর্তমানে করোনা কিছুটা স্থীতিশীল রয়েছে। হাসপাতালে শতাধিক করোনা রোগী ভর্তি রয়েছে। রোগীরা বলেছেন এই হাসপাতালে করোনা উন্নত চিকিৎসাসেবা ও খাবার দেয়া হচ্ছে। এখানে ভাল চিকিৎসা হচ্ছে খবরে ময়মনসিংহ ছাড়াও নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও সিরাজগঞ্জ জেলার রোগীরাও এখানে এসে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। ময়মনসিংহ মেডিকেলের নতুন ভবনে করোনা ডেডিকেটেড ইউনিট চালু করতে অনেকের অবদান রয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ বিএমএ সভাপতি ডাঃ মতিউর রহমান ভুইয়া ও সাধারণ সম্পাদক ডাঃ এইচ এ গোলন্দাজ তারা সহ নেতৃবৃন্দ বলিষ্ট ভুমিকা রেখেছেন। এর মধ্যে অগ্রণী ভুমিকা পালনকারী বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) ময়মনসিংহ শাখার সাধারণ সম্পাদক ডাঃ এইচ এ গোলন্দাজ তারা বলেন, ময়মনসিংহ মেডিকেলের নতুন ভবনে করোনা ডেডিকেটেড ইউনিট চালু করতে গিয়ে অনেক আন্দোলন, সংগ্রাম করতে হয়েছে। একটি পক্ষ এর চরম বিরোধীতা করেছে।

বিএমএ ময়মনসিংহ শাখা এই দাবী আদায়ে অবস্থান কর্মসুচী পর্যন্ত পালন করেছে। যারে ফলে বৃহত্তর ময়মনসিংহের করোনা আক্রান্ত বিশাল জনগোষ্টি চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বিএমএ এর যুক্তিক দাবীর পক্ষে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, স্বাচিব কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব অধ্যাপক ডাঃ এম এ আজিজ, তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসান, জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান ও সাংবাদিকসহ আরো অনেকেই বলিষ্ট ভুমিকা পালন করেছেন।

আমরা বিএমএ পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। করোনার বড় ধরনের ধাক্কা কিভাবে সামাল দিলেন প্রশ্নে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল ফজলুল কবীর বলেন, আল্লাহর রহমতে, ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতার কারণে করোনার বড় একটি ঝুকি মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। সে সময় কত যে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি তার হিসেব নেই। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি রোগীকে মনিটরিং করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিটা রোগীর ঔষধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা মানসম্মত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। ৪ স্তরের সুপারভিশন ছিল।

কোন রোগী উন্নতি হচ্ছে। কোন রোগী অবনতি হচ্ছে। প্রতিটি রোগীর তথ্য প্রশাসন, ডাক্তার, নার্স, সবার কাছে চলে যেত। সরকারের পাশাপাশি গৃহায়ণ ও গণপুর্ত মন্ত্রী শরীফ আহমেদ এমপি, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বাবু এমপি, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়র



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *