দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ শীতবস্ত্র তৈরী হয় এই কোচাশহর এলাকায়। শিল্পক্ষেত্রে অনগ্রসর গাইবান্ধা জেলার একমাত্র শিল্পাঞ্চল হিসেবে এই এলাকা পরিচিতি লাভ করেছে। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের পাশাপাশি পার্শ্বর্বর্তী মহিমাগঞ্জ, শালমারা, শিবপুর ও বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলাতে অনেক হোসিয়ারী কারখানা গড়ে উঠেছে। তবে এই জেলার সবচেয়ে বড় হোসিয়ারী পাইকারী বাজার গড়ে উঠেছে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের নয়ারহাটে। আসন্ন শীত মৌসুম উপলক্ষে কয়েকশ কারখানায় তৈরী হচ্ছে নানা রকমের বাহারী শীতবস্ত্র। এর মধ্যে রয়েছে সোয়েটার, মাফলার, কার্ডিগান, মোজা, শিশুদের পোশাক এমনকি মেয়েদের চুল বাঁধার গার্ডারব্যান্ড। একটি ছোট কাখানায় বছরে প্রায় ১০ হাজার পিছ সোয়েটার এবং তুলনামূলকভাবে বড় কারখানাগুলো প্রতি বছর প্রায় ১ লক্ষ পিছ সোয়েটার তৈরী হয়। এ বছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার শীতবস্ত্র আসন্ন শীতে বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। যেন দম ফেলারও ফুরসৎ নেই। কেউ দক্ষ কারিগর হয়ে কারখানায় মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন, কেউ তৈরী শীতবস্ত্র সেলাই করছেন। আবার তুলনামূলকভাবে বয়স্ক ব্যক্তি ও মহিলারা সুতা তোলার কাজ করে। পরিবারের সকল সদস্যই প্রায় কোন না কোন ভাবে এই কারখানা গুলোর সাথে জড়িত। হোসিয়ারী কারিগর জহুরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে সে জানায়, কয়েক বছর যাবত সে এই পেশায় কাজ করছে। অন্য কোন চাকুরী বা কাজের সংস্থান করতে না পেরে প্রথমে স্বল্প মজুরীতে কাজে যোগ দিয়ে কাজ শিখে এখন সে পরিবারের প্রধান উপর্জনক্ষম ব্যক্তি। পরিবারের সদস্যদের ৩ বেলা আহারের সংস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানের লেখাপড়ার খরচের জন্য এখন আর দু:শ্চিন্তা করতে হয়না। তাই সে তাঁর ছোটভাই জুয়েল মিয়াকেও এই পেশায় এনেছে। নয়ারহাটে অবস্থিত রাসেল ফ্যাশানের কর্ণধার শাহাদুল ইসলাম জানালেন, এই খাতে সরকারিভাবে তেমন কোন পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নানা রকম সমস্যার সন্মূখীন হচ্ছেন কারখানা মালিকরা। কারখানার কাজের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত সূতা মুলক ভারত, থাইল্যান্ড, চীন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু সূতা আমদানীর ক্ষেত্রে মোটা অংকের ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছেন তাঁরা। তিনি জানান, ভারত থেকে আমদানী করা প্রতি কেজি বেবীসপ সূতার জন্য ১৪০ টাকা ট্যাক্স দিতে হয়। এছাড়া আমদানীকৃত সূতা বন্দর থেকে দ্রুত খালাস করা হয়না। অনেক সময় প্রয়োজনীয় সূতার অভাবে কারখানা বন্ধ রাখতে হয়। কারখানা মালিক খাজা মিয়া জানান, এই এলাকার রাস্তা-ঘাট খুবই সরু হওয়ায় মালামাল পরিবহনে অসুবিধা হয়। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা তৈরী শীতবস্ত্র কিনতে এখানে আসতে অনাগ্রহ দেখান। এছাড়াও এখানে অন লাইন ব্যাংকিং সেবা না থাকায় ব্যবসা ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে। আরেক কারখানা মালিক তছলিম উদ্দিন জানালেন, প্রয়োজনীয় পূঁজির অভাবে অনেকেই কারখানা চালাতে পারছেন না। বে-সরকারি ব্যাংকগুলোর চড়া সুদ এবং জটিল শর্তের কারণে অনেকেই মধ্যসত্বভোগী দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ব্যবসার জন্য টাকা নিয়ে আশানুরূপ ব্যবসা করতে না পেরে সর্বশান্ত হয়েছে। এছাড়াও বিদ্যুৎ সমস্যা এই শিল্পের বড় প্রতিবন্ধকতার নাম। যার ফলে আশানুরূপ শীতবস্ত্র উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। যদি এসব সমস্যার সমাধান করে এখানে উৎপাদিত শীতবস্ত্র বিদেশে রপ্তানীর ব্যবস্থা করা হয় তাহলে এই শিল্পের সাথে জরিত মালিক-শ্রমিক সকলেই লাভবান হবে এবং এলাকায় আর্ত সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। সেই সাথে দেশ প্রতি বছর বিপল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে।