শিক্ষা সফরে সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া কাহিনি।

আমার নাম এবিএম কাইয়ুম রাজ। সুন্দরবনের পাশেই আমার বাড়ি, কিন্তু কখনো সেখানে যাইনি। এবার স্কুল থেকে শিক্ষা সফরের সুযোগ হলো। বন্ধু তামজিদ আর সোহাগের সঙ্গে আমি যেন স্বপ্নের রাজ্যে পা দিলাম।

 

সুন্দরবন! বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। নদী, গাছপালা, বন্যপ্রাণী—সব মিলে এক রহস্যময় পরিবেশ। আমাদের দল নৌকায় চড়ে বনের গভীরে ঢুকে পড়ল। গাছের ফাঁকে ফাঁকে রোদ, নৌকার গুনগুন শব্দ, আর নদীর হালকা ঢেউ যেন স্বপ্ন দেখাচ্ছিল।

 

নৌকা থেকে নেমে সবাই দল বেঁধে বনের পথে হাঁটতে শুরু করল। আমি একটু আলাদা হয়ে গেলাম, কিছু ছবি তোলার জন্য। ফটাফট ছবি তুলতে তুলতে কখন যে দলের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছি, বুঝতেই পারিনি। চারদিকে শুধু গাছ আর গাছ। কিচিরমিচির পাখির ডাক, আর নদীর পানির মৃদু আওয়াজ। কিছুক্ষণ পর টের পেলাম, আমি একা।

 

গভীর বনের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। প্রথমে ভয় পেলেও, পরে মনে হলো আমি যেন কোনো সিনেমার চরিত্র। নৌকার শব্দ, মানুষের কোলাহল কিছুই আর শোনা যাচ্ছে না। মোবাইলের নেটওয়ার্কও নেই। কয়েকবার চিৎকার করলাম, “তামজিদ! সোহাগ!” কিন্তু কোনো উত্তর নেই।

 

ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে লাগলাম। ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। হঠাৎ নদীর ধারে এসে পড়লাম। মনে হলো এখান থেকে কিছু একটা করার চেষ্টা করা যায়। নদীর ধার ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম দূরে নৌকার আলোর ঝলক। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলাম। আলোর দিক থেকে একটা শব্দ এলো, “রাজ! তুমি কোথায়?”

 

তামজিদ আর সোহাগ নৌকা নিয়ে খুঁজতে বেরিয়েছিল। আমাকে দেখে ওরা যেন প্রাণ ফিরে পেল। আমিও যেন আবার জীবন ফিরে পেলাম। সেই দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিয়ে গেল—জায়গার প্রতি যতই ভালোবাসা থাকুক না কেন, সাবধানতা আর সতর্কতা না থাকলে বড় বিপদ হতে পারে।

 

সেই দিনের কথা আজও মনে পড়লে মনে হয়, সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্যের সঙ্গে তার রহস্যময়তাও সমান ভয়ঙ্কর। তবে এই ঘটনার পর সুন্দরবনের প্রতি আমার ভালোবাসা যেন আরো গভীর হয়ে গেছে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *