মাদক বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি


দেখা যায়, যে সন্তান পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতে পারতো, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করে দেশের গর্বে পরিণত হতে পারতো, সেই সন্তান আজ মাদকের স্পর্শে, মাদকের করাল গ্রাসে কেবল ধ্বংশ-ই হচ্ছে না, ধ্বংশ করে দিচ্ছে একটি পরিবারের সুখের স্বপ্ন।
একটি সুখী পরিবারের সুখ-শান্তি এমনকী সুন্দর একটি স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করার ক্ষেত্রেও মাদকের অপতিরোধ্য ভূমিকা বিশেষভাবে কার্যকর। আজ মাদকের এই নীল ছোবলে দংশিত দেশের যুব সমাজের একটি বড় অংশ। আসুন, মাদক সম্পর্কে জানি এবং মুক্ত আলোচনা করি। মাদক কী?
মাদক দ্রব্য হলো একটি ভেষজ দ্রব্য যা ব্যবহারে বা প্রয়োগে মানবদেহে মস্তিস্কজাত সংজ্ঞাবহ সংবেদন হ্রাসপায় এবং বেদনাবোধ কমায় বা বন্ধ করে।
মাদক দ্রব্যের বেদনানাশক ক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকে তন্দ্রাচ্ছন্নতা, আনন্দোচ্ছাস, মেজাজ পরিবর্তন, মানসিক আচ্ছন্নতা, শ্বাস-প্রশ্বাস অবনমন, রক্তচাপ হ্রাস, বমনেচ্ছা ও বমি, কোষ্টবদ্ধতা ও মূত্ররাস দেখা দেয়।
মাদক দ্রব্যকে সহজভাবে বলা যায় যা গ্রহণে মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব পড়ে ও যে দ্রব্য আসক্তি সৃষ্টি করে, তাই মাদকদ্রব্য। মাদকাসক্তি কী?
মাদকাসক্তি হলো- মানুষের এমন একটি অবস্থা; যা ব্যবহারে মানুষ অভ্যস্থ হয়ে পড়ে এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর মাদক গ্রহণের অভ্যাস্থ হওয়াই মাদকাসক্ত। মাদকাসক্ত আক্রান্ত যে কেউ হঠাৎ মাদক গ্রহণ না করতে দিলে নানান ধরণের উপসর্গ দেখা দেয়।
তথ্যসূএ জানায়, মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে সাধারণত ১৫ থেকে ৩৫ বছরের বয়সের মানুষ, যার হার ৭০ ভাগ। অন্যদিকে মাদক গ্রহণের গড় বয়স ২২ বছর। মাদকাসক্তির লক্ষণসমূহ জেনে নিনঃ
নিম্নে বর্ণিত কারণসমূহ মাদকাসক্ত ব্যক্তির আচরণ, অভ্যাস এবং চলনে দেখা যায়।
* হঠাৎ নতুন বন্ধুদের সাথে চলাফেরা শুরু করা।
* বিভিন্ন অজুহতে ঘনঘন টাকা চাওয়া।
* আগের তুলনায় দেরিতে বাড়ি ফেরা।
* রাতে জেগে থাকা এবং দিনে ঘুমের প্রবণতা বৃদ্ধি করা।
* ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর অস্বাভাবিক আচরণ করা।
* খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেয়া এবং ওজন কমে যাওয়া।
* অতিরিক্ত মাত্রায় মিষ্টি খেতে আরম্ভ করা এবং ঘনঘন চা, সিগেরট পান করা।
* অযথা টয়লেটে দীর্ঘ সময় ব্যয় করা।
* ঘনঘন পাতলা পায়খানা হওয়া।
* প্রচুর ঘুমহওয়া অস্থিরতা এবং অস্বস্তি বোধ করা।
* যৌন ক্রিয়ায় অনীহা এবং যৌন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া।
* মিথ্যে কথা বলার প্রবণতা।
* পরিবারের সদস্যদের সাথে সবসময় মনোমালিন্য লেগে থাকা।
* অকারণে বিরক্ত বোধ করা। হঠাৎ মনমানসিকতা বিরিবর্তন দেখা দেয়া।
* ঘরে তামাকের বা সিগারেটের টুকরো পড়ে থাকা। যেমন- প্লাস্টিকের বা কাঁচের বতল, কাগজের পুরিয়া, ইনজেকশন, খালি শিশি, পোড়ানো দিয়াশালাই এর কাঠি’সহ নানাবিধ অস্বাভাবিক জিনিস।
* লেখাপড়া, খোলাধুলো, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সব সময় অনীহা।
* কাপড়-চপড়ে দুর্গন্ধ বৃদ্ধি পাওয়া ও পোড়া দাগ লেগে থাকা।
ইত্যাদি একাধিক বিষয় পরিলক্ষিত ব্যক্তি মাদকাসক্ত তা নিশ্চিত ভাবেই সন্দেহ করা যায়।
বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের অনেকে মরণ নেশা ফেনসিডিলে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এক শ্রেণির কথিত সমাজবিরোধী, দেশোদ্রোহীরা বিভিন্ন মাধ্যমে ফেনসিডিল, মদ’সহ নানান ধরনের নেশা জাতীয় দ্রব্যের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে আর্থসামাজিক পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে।
যে হাত শ্রমিকের হওয়ার কথা, যে হাত সৃষ্টিশীলতা এবং সমাজ উন্নয়নের ক্ষেত্র নিশ্চিত করণের কথা, সেই হাতে এখন অতি সহজে-ই মিলছে মরণ নেশা ‘মাদক’।
মাদকসেবী এবং মাদক বিক্রেতারা কেবল সমাজের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তা নয়; তারা পারিবারিক শান্তিও বিনষ্ট করছে। অনেক ‘বাবা-মা’ মাদকসেবী সন্তানের অত্যাচারে, অনাচারে এবং নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে আইনের আশ্রয় নিয়ে নিজ সন্তানকে পুলিশের হাতে দিয়ে জেলখানায় বন্দী রাখার ব্যবস্থা করতেও কার্পন্য করেন না।
আজ মাদকের এই করাল উপস্থিতি কিংবা মাদক গ্রহনে কেবলমাএ পরিবারের বা সমাজের শান্তি-ই বিনষ্ট হচ্ছে তা নয়; মাদকসেবী নিজেকেও নিঃশেষ করে দিয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছেন।
তাই আসুন, মাদক’কে আমরা না বলি, ঘৃনা করি। এবং সামাজিকভাবে তাদের বয়কট করে দেশের সকল শ্রেণির মানুষকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করি।
সেই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্থাগুলাকেও মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি অধিকতর তৎপরতা অবলম্বন করে মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী এবং মাদকের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সকলকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টাতমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদেরকে যারা আশ্রয় এবং প্রশ্রয় দেন; তারা দেশ ও জাতির শত্রু। তাদের বয়কট করে মাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পাশা-পাশি তাদের সম্পর্কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীরকে অবহিত করতে হবে।